মেকআপ রুমের ভেতরে নিস্তব্ধতা যেন একটি ভারি কাফনের কাপড়ের মতো সাফওয়ানকে চেপে ধরছে। বাইরে থেকে আসা মানুষের কোলাহল আর তালি এখন অনেক দূরবর্তী কোনো গ্রহের শব্দ বলে মনে হচ্ছে। ঘরটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলেও সাফওয়ানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সে ধীর পায়ে ঘরের মাঝখানে রাখা বিশাল দীর্ঘকায় আয়নাটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
এই আয়নাটি কেবল কাঁচ আর পারদ দিয়ে তৈরি নয়; আজ এটি যেন সাফওয়ানের কাছে ‘মিজানের পাল্লা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়নার চারধারে বসানো উজ্জ্বল এল’ইডি আলোগুলো তার প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ক্লান্তি আর প্রতিটি মিথ্যেকে নিষ্ঠুরভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
প্রতিচ্ছবির সাথে কথোপকথন
সাফওয়ান আয়নার দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন সুপুরুষ, যার পরনে শুভ্র জুব্বা, কাঁধে আভিজাত্যের শাল। কিন্তু সাফওয়ান সেই মানুষটির চোখের ভেতরে তাকাতেই শিউরে উঠল। সেই চোখে কোনো তৃপ্তি নেই, আছে এক গভীর আধ্যাত্মিক শূন্যতা। সে দেখল, তার সেই ‘ইমানি নূর’ যা একসময় ভক্তদের মুগ্ধ করত, তা আজ এক ধোঁয়াটে কালিমায় ঢাকা পড়ে গেছে।
ইমাম গাজ্জালি বলেছিলেন—"মানুষের নফস হলো এক শিকারি নেকড়ের মতো, যাকে তুমি যদি বশ না করো, তবে সে তোমার সুন্দরতম গুণগুলোকে ছিঁড়ে খাবে।" সাফওয়ান আজ বুঝতে পারছে, তার ভেতরের সেই নেকড়েটি আজ তাকেই খেয়ে ফেলেছে। সে আয়নার দিকে আঙুল উঁচিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করল—"কে তুমি? এই যে জুব্বা পরে দাঁড়িয়ে আছো, এটি কি তোমার পোশাক নাকি তোমার কবরের কাফন? তুমি কি সেই সাফওয়ান যে কি না সিজদায় গেলে ওঠার কথা ভুলে যেত? নাকি তুমি সেই অভিনেতা, যে টাকার বিনিময়ে আর খ্যাতির নেশায় আল্লাহর নাম বিক্রি করছ?"
মেকআপ রুমের কৃত্রিমতা
এই মেকআপ রুমটি আড়ম্বরপূর্ণ হলেও এটি কৃত্রিমতায় ঠাসা। মেকআপ টেবিলের ওপর পড়ে আছে বিভিন্ন রঙের ফাউন্ডেশন, পাউডার আর সুগন্ধি। এই জিনিসগুলো মানুষের বাইরের খুঁত ঢেকে দিতে পারে, কিন্তু ভেতরের পচন ঢাকার কোনো প্রলেপ কি আজও আবিষ্কৃত হয়েছে?
সাফওয়ান টেবিল থেকে একটি সুগন্ধির শিশি তুলে নিল। এটি সেই দামী আতর, যা সে সাহেলার সাথে দেখা করার আগে মেখেছিল। আজ এই সুগন্ধি তার কাছে পচা লাশের গন্ধের মতো ঠেকছে। ঘরের কোণে রাখা দামী সোফা, দেয়ালে ঝোলানো বাহারি ক্যালিগ্রাফি—সবকিছুই যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। প্রতিটি জিনিস যেন বলছে, "সাফওয়ান, তুমি সাজিয়েছ কেবল তোমার বাইরের জগতকে, অথচ তোমার ভেতরটা আজ এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ।"
বাইরে থেকে মরিয়মের ডাক আবার শোনা গেল, "সাফওয়ান? তুমি কি ঠিক আছো? দরজা খুলছ না কেন?"
মরিয়মের কণ্ঠস্বরটি আজ এক পবিত্র সুরের মতো সাফওয়ানের কানে বাজল। কিন্তু সেই সুর তাকে শান্তি দিচ্ছে না, বরং তার অপরাধবোধকে আরও উসকে দিচ্ছে। সাফওয়ান ভাবছে, মরিয়ম যদি জানত এই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আজ তার ইমান বিক্রি করে এসেছে, তবে কি সে আজও এমন মায়া দিয়ে ডাকত?
মানসিক দ্বন্দ্ব ও আধ্যাত্মিক মৃত্যু
সাফওয়ান আয়নার ওপর হাত রাখল। কাঁচের শীতল স্পর্শ তার তপ্ত তালুতে এক কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। সে নিজের প্রতিচ্ছবিকে লক্ষ্য করে বিড়বিড় করল—"মানুষ আমাকে চিনেছে আমার সুর দিয়ে, কিন্তু আমার রব আমাকে চিনেছেন আমার নিয়ত দিয়ে। হায় আফসোস! আমি মানুষের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য আমার রবের কাছে অপ্রিয় হয়ে গেলাম।"
তার মনে পড়ল ইয়াসমিন মুজাহিদের সেই গভীর দর্শন—"আমরা যখন আল্লাহর চেয়ে কোনো সৃষ্টিকে বেশি ভালোবাসতে শুরু করি, তখনই আমাদের পতনের শুরু হয়।" সাহেলা তার কাছে সেই সৃষ্টি, যাকে সে মরিয়মের চেয়েও বড় করে দেখেছে, যাকে সে আল্লাহর বিধানের চেয়েও গুরুত্ব দিয়েছে। সাহেলার সেই মেসেজ—"আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?"—সাফওয়ানের মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো পিটছে। হ্যাঁ, সে ভয় পাচ্ছে। সে তার ইমেজ নষ্ট হওয়ার ভয় পাচ্ছে, সে নিঃস্ব হওয়ার ভয় পাচ্ছে। কিন্তু সে কি তার রবকে ভয় পাচ্ছে?
একটি চরম মুহূর্ত ও সংকল্পের অপমৃত্যু
সাফওয়ান পকেট থেকে ফোনটি বের করল। ভাঙা স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে সাহেলার সেই মায়াবী ডিপি (Display Picture) দেখা যাচ্ছে। শয়তান আবার তার কানে ফিসফিস করল—"ভয় পেয়ো না। এই অন্ধকার তোমাকেই মানায়। তুমি তো শিল্পী, তোমার জীবনে একটু আধটু নিষিদ্ধ ভালোবাসা না থাকলে বিরহ আসবে কোত্থেকে? এই বিরহ না থাকলে তোমার নাশিদ হবে কী করে?"
সাফওয়ান একবার ভাবল ফোনটা আছাড় মেরে চিরতরে ভেঙে ফেলবে। কিন্তু তার হাত যেন অবশ হয়ে এল। পাপের নেশা আর মদের নেশা প্রায় এক—মানুষ জানে এটি তাকে ধ্বংস করবে, তবুও সে সেই বিষ পান করে।
সে আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে আর নিজেকে সহ্য করতে পারছে না। সে বুঝতে পারল, পরকিয়া কেবল একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, এটি আসলে মানুষের রূহকে পঙ্গু করে দেওয়ার এক ঐশ্বরিক শাস্তি। যখন কেউ তার হালাল সঙ্গীকে অবজ্ঞা করে হারামের স্বাদ খোঁজে, তখন আল্লাহ তার হৃদয় থেকে সুখের অনুভূতিই কেড়ে নেন।
সাফওয়ান ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে হাত বাড়াল লক খোলার জন্য। কিন্তু তার মনে হলো, দরজা খোলার পর সে যে আলোতে যাবে, সেই আলো সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই। সে এখন অন্ধকারের কীট হয়ে গেছে।
সে লক ঘোরাল। খট করে একটি শব্দ হলো। দরজা খুলে যেতেই সে দেখল মরিয়ম দাঁড়িয়ে আছে। মরিয়মের হাতে এক গ্লাস পানি আর একটি জায়নামাজ। মরিয়ম বলল, "সাফওয়ান, অনেক তো হলো মানুষের সামনে গান গাওয়া। রাত শেষ হয়ে আসছে। এবার চলো, মালিকের সামনে দু'রাকাত নামাজ পড়ে নিই। তোমার চেহারাটা খুব ফ্যাকাসে লাগছে।"
সাফওয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মরিয়মের দেওয়া ওই জায়নামাজটি যেন আজ তার জন্য এক বিচারকের আসন। সে কি পারবে ওই জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলতে? নাকি তার এই ‘সাফওয়ান’ পরিচয়টি আজ রাতেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে?
মরিয়মের এই ঐশ্বরিক আহ্বানে কি সাফওয়ানের হৃদয় গলে যাবে? নাকি সে সাহেলার পাঠানো কোনো গোপন ইশারায় আবারও অন্ধকারে ডুব দেবে? জানতে চোখ রাখুন আমদের এই সাইটে।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।